মাহে রমজানের তাৎপর্য এবং আমাদের করণীয়

“মৌলানা ছাবের আহমদ”

জুমাবার সপ্তাহের যেমন শ্রেষ্ঠ দিন, অনুরূপ রমযান হচ্ছে বছরের শ্রেষ্ঠ মাস। পবিত্র কোরআন নাযিলের কারণে এ মাসের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাই এ মাসের সওয়াব ও ফযীলত লাভের জন্য ঈমানদারগণ সর্বদা চেষ্টায় থাকেন। ব্যবসায় মৌসুমে বেশি মুনাফার জন্য ব্যবসায়ীরা যেমন রাত-দিন একাকার করে মেহনত করেন, তদ্বরূপ ঈমানদাররা পরকালে নাযাত ও চিরস্থায়ী জান্নাত লাভের আশায় এ মাসে কোমর বেঁধে এবাদতে আত্মনিয়োগ করেন।
অতীতের মনিষীগণ রমযানের অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই রমযানের মাস নসিব হওয়ার জন্যে আল­াহর নিকট প্রার্থনা করতেন। মহানবী (সঃ) রমযানের প্রস্তুতি শাবান মাস থেকে নিতেন এবং অন্যান্য মাসের তুলনায় তিনি শাবান মাসে বেশি রোজা রাখতেন বলে হাদিসে উল্লেখিত হয়েছে। অন্য হাদিসে এসেছে, রজবের শুরুতে (আল্লাহর নবী) মহানবী (স.) দোয়ায় বলতে, হে আল্লাহ, রজব ও শাবানকে আমার জন্য বরকতময় বানাও এবং রমযান আমার ভাগ্যে নসিব কর। আল্লাহ পাক রমযানে আমাদের জন্যে অনুগ্রহের ভান্ডার মুক্ত করেন। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। জান্নাতের সকল কপাট খুলে দেন এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেন। শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে দেন। রোযাদারের প্রত্যেকটি নেক আমলের সওয়াব সাতশ গুণ বৃদ্ধি করেন। প্রত্যেক রাতের বেলায় দুনিয়ার আকাশে নেমে এসে তিনি এই বলে বান্দাদের ডাক দেন যে, কে আছ-আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাকে ক্ষমা করব। কে আছ, আমার কাছে দোয়া চাইলে তার দোয়ায় সাড়া দেব। কে আছ-আমার কাছে কিছু চাইলে আমি সেটা দেব। এভাবে রমযানের গুরুত্ব ও ফযিলত সম্পর্কে আরও বহু কথা উল্লেখ আছে। এগুলো ছাড়াও রোযাদারদের জন্যে আরও বহু পুরস্কার রয়েছে যা মানুষকে জানান হয়নি। এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন ‘আল্লাহ পাকের কাছে রমযানের এমন বহু পুরস্কার সংরক্ষিত যে, মানুষ যদি সে সম্পর্কে জানত তবে তারা সারা বছর রমযান কামনা করত। কাজেই, যে এ মাসের সুযোগের সদ্ব্যবহার করল, সে হলো খুশসিব। আর গোনাহর কাজে যে এ মাসকে ব্যয় করল সে হল চরম বদনছিব।
বনি আদমকে পথভ্রষ্ট করার জন্য শয়তান তাদের দেহে এমনভাবে বিচরণ করে, যেমন দেহের মধ্যে রক্ত চলাচল করে। সে কারণে অনেক মানুষ দিন-রাত গোনাহে লিপ্ত থাকে। হাত, পা, চোখ, কান, জিহŸা এবং কল্ব-কোনটিই গোনাহ মুক্ত থাকে না। আল্লাহর নবী (সাঃ) বলেছেন, কোন কোন মানুষের জিহŸা তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপের কারণ হয়। সে জন্যে এ সমস্ত গোনাহ থেকে পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন, যাতে সে দুনিয়া থেকে পুত-পবিত্র হয়ে বিদায় গ্রহণ করতে পারে।
মাতৃস্নেহের কারণে মা যেমন নিজের আদরের বাচ্চাকে আগুনের কুন্ডলীতে পড়তে দেয় না, তেমনি আল­াহর কোন বান্দা দোযখে নিক্ষিপ্ত হোক সেটা তিনি চান না। বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালবাসা শিশুর প্রতি মায়ের স্নেহের তুলনায় অনেক বেশী। মূলতঃ গোনাহ্ থেকে পবিত্রতা অর্জন এবং আল­াহর সান্নিধ্য লাভের জন্য মুসলিম উম্মাহকে রমযানের রোযার উপহার দেয়া হয়েছে। প্রভুর পক্ষ থেকে তাদের জন্য এটা মূল্যবান উপহার। সুস্থ ও সবল অবস্থায় পুনরায় মাসটি ভাগ্যে জোটা তাঁরই অনুগ্রহ বৈকি। তাই আল­াহর নিয়ামতের শোকর আদায় করা উচিৎ। এক্ষেত্রে শোকর করার প্রকৃত পন্থা হলো সঠিক নিয়মে এ মাসের রোজা রাখাসহ যাবতীয় এবাদত পালন করা। দিনের বেলায় খানাপিনা কামনা বাসনা থেকে বিরত থাকা এবং সেই সাথে দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে গোনাহ থেকে সংযত রাখার নাম হচ্ছে রোযা। আর এটাই হচ্ছে রোযার লক্ষ্যে। রমযান মাস ছাড়া অন্য মাসে এ ধরনের প্রক্রিয়া কার্য সম্ভব নয় বলে তিনি এ মাসটি আমাদের জন্য মনোনীত করেছেন।
রমযানের লক্ষ্য অর্জন এবং তার শিক্ষাকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে কার্যকর করার জন্যে কতিপয় মৌলিক কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিটি রোযাদারকে সে সম্পর্কে অবগত থাকা প্রয়োজন। তাই নিম্নের কয়েকটি পরামর্শ সকলের কাছে রাখছি।
১। রমযানে রোযা রাখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। রোযার উদ্দেশ্য হলো আল­াহর সন্তুষ্টি লাভ, নিজের আমলের সংশোধন ও পরকালের মুক্তি বা নাজাত। তারপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে রোযা অবস্থায় আমি আমার হাত পা, কান, চোখ, জিহŸা এবং কলবকে পাপ-পঙ্কিলতা হতে মুক্ত রাখব। আল­াহ ও তাঁর রাসুলের বিধানমত আমার জীবন পরিচালিত করব।
২। কুরআন তিলাওয়াত করা:- যেহেতু রমযানের সাথে পবিত্র কুরআনের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেহেতু রোযাদারের সম্পর্কও কুরআনের সাথে গভীর হওয়া উচিত। দৈনন্দিন কুরআন তিলাওয়াতের সাথে যে কোন সূরা অথবা সূরার অংশ অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ অধ্যয়ন করা উচিত। রমযানের রোযা এবং কুরআন মজিদ কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আযাব থেকে নাজাত কামনা করে আল­াহর নিকট সুপারিশ করবে এবং তিনি উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করবেন। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিসে নবী করিম (সাঃ) বলেন, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ রোজ-কিয়ামতে এই কুরআন তোমাদের জন্য সুপারিশ করবে। (বুখারী)।
৩। নামায পড়া:- অর্থাৎ দৈনিক পাঁচওয়াক্ত নামায প্রতিটি মুসলমান নর-নারীর প্রতি ফরয। অতএব, এ ব্যাপারে অবহেলা করার অবকাশ নেই। মুসলমানের প্রধান পরিচয় হলো নামায। হাশরের মাঠে প্রথমে নামায সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। এই ফরয নামায মসজিদে জামায়াতে নামাযের সওয়াব সাতাইশ গুণ বেশি। রমযানে জামায়াতে নামায পড়ার অভ্যস্ত হওয়ার বিরাট সুযোগ রয়েছে।
৪। তারাবীহর নামায সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। রমযান মাসে তারাবীহর নামাজ জামায়াতের সাথে আদায়ের প্রথা রাসুলুল্লাহর (সাঃ) সময় হতে প্রচলিত হয়ে আসছে। নবী করিম (সাঃ) এরশাদ করেন, ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় যে কিয়ামুললাইল সালাত পড়বে, তার অতীতের সকল গোনাহ (সগিরা) মাফ হয়ে যাবে। (বুখারী/মুসলিম)। এখানে কিয়ামুললাইল বলতে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদের নামায বুঝানো হয়েছে।
৫। এস্তেগফার অর্থাৎ গোনাহ মাফ চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা। এর অপর নাম তওবা।
এস্তেগফারের অনেক ফায়দা রয়েছে। যেমন এস্তেগফারের ফলে রিজিক বৃদ্ধি পায়। বিপদ-আপদ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আল্লাহর রহমত আসে, পরিবারে ও ধনসম্পদে বরকত হয়। আল্লাহর নবী (সাঃ) দৈনিক একশ’র অধিক এস্তেগফার পড়তেন। তওবা কবুলের জন্য মোট চারটি শর্ত উপস্থিত থাকতে হয়। এক. গোনাহকে মন দিয়ে ঘৃণা করা। দুই. গোনাহের কাজ সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা। তিন. গোনাহ না করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা। কোন ব্যক্তির অধিকার নষ্ট হলে ঐ ব্যক্তির কাছ থেকে মাফ চাওয়া। অথবা সেটা তার কাছে ফেরত দেয়া। আর সেই লোক মারা গেলে অথবা তার কোন সন্ধান না পাওয়া গেলে তার জন্যে দোয়া করা। এ চারটি শর্ত একসঙ্গে না পাওয়া গেলে তওবা কবুল হয় না বলে আলেম ও শরীয়তের বিশেষজ্ঞদের ঐক্যমত রয়েছে।
৬। দোয়া কবুলের বিশেষ বিশেষ সময় রয়েছে। যেমন পাঁচওয়াক্ত নামাযের শেষে দোয়া, আযান ও একামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া, শেষ রাতের দোয়া, ইফতারের সময়ের দোয়া, রোযা অবস্থায় দোয়া, শুক্রবার আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়ের দোয়া ইত্যাদি। তবে হারাম উপার্জনকারী, অবৈধ খাদ্য ভক্ষণকারী এবং জালেমের দোয়া কখনো কবুল হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, যদি কেউ অন্য কোন ভাইয়ের ইজ্জতের উপর হামলা করে থাকে অথবা অন্যায়ভাবে তার কোনকিছু নিয়ে থাকে তবে সে যেন সেদিনের আগেই তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়, যেদিন তার পয়সা-কড়ি কিছুই কাজে আসবে না। আত্মীয়তার সম্পর্ক বিচ্ছেদকারীর দোয়া কবুল হয় না।
৭। তাহাজ্জুদের নামায: আল­াহর নিকট এ নামাযের অনেক সওয়াব ও ফযিলত রয়েছে। রাতের শেষার্ধে একটি সময় নির্দিষ্ট করে তাহাজ্জুদ নামায পড়ার চেষ্টা করতে হবে। তিরমিযিতে বর্ণিত হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেন, ‘হে লোকেরা, সালাম বিনিময়কে প্রসারিত কর। মানুষকে খেতে দাও। আত্মীয়তার বন্ধনকে অটুট রাখ। নিশি রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায (তাহাজ্জুদ) পড়। তবে নিরাপদে জান্নাতে যাবে।
৮। রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতসমূহকে কদরের রজনী যেনে সারারাত এবাদতে মগ্ন থাকা উচিত। এ রাতের বহু ফযিলত। যেমন: এক. মানবজাতির হেদায়াত ও কল্যাণের উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআন এ রাতে নাযিল হয়। দুই. কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তিন. রহমতের ফিরিশতাগণ মোমেনদের জন্য কল্যাণ বহন করত এ রাতে দুনিয়ায় অবতরণ করেন। চার. এ রাতে ঘুমাতেন না। তিনি স্বয়ং জেগে থাকতেন এবং পরিবারের সবাইকে জাগ্রত রাখতেন।
৯। শেষ দশ দিন এতেকাফ করা:- আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) প্রতি রমযানের শেষ দশ দিন এতেকাফ করতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহর নবী জীবনের শেষ রমযানে একাধারে বিশ দিন এতেকাফ করেন। দুনিয়ার চিন্তা, ব্যস্তা ও কাজকর্ম ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহর ঘরে অবস্থান করাকে এতেকাফ বলা হয়। এটাও রমযানের একটি বৈশিষ্ট্য। মাসের শেষ দশ দিন অথবা নয় দিন এতেকাফ করা সুন্নত। তিন দিন এতেকাফ করা সুন্নতের খেলাফ।
১০। সম্মিলিত ইফতার করা। অর্থাৎ কোন রোযাদারকে সঙ্গে নিয়ে ইফতার করা। এতে করে নিজে ও অন্য ভাইকে ইফতার করানোর সওয়াব পাওয়া যায়। তবে ঐ রোযাদারের সওয়াবে কোন ঘাটতি হবে না। (তিরমিযি)।
১১। শক্তি ও সামর্থ্য থাকলে হারাম শরীফে উমরা পালন করা। এই উমরার ফযিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, রমযানে উমরাহ পালনকারী একটি হজ্জের সওয়াব পাবে।
১২। রমযানের মধ্যে সদকায় ফিতর আদায় করা। এ প্রসঙ্গে এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ফিতরা হচ্ছে রোযাদারের পাপ ও অল্লীলতা পবিত্রকারী। সেই সাথে এই ফিৎরা ফকির ও অভাবীদের জন্য খাদ্যের বস্তু। (আবু দাউদ)। অন্য এক হাদিসে তিনি এরশাদ করেন, ‘কোন অভাবগ্রস্থ ভাইয়ের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা, তার ক্ষুধার যন্ত্রণা দূর করা এবং তাকে পেরেশানিমুক্ত করার ফলে নিজের গোনাহ মাফ হয়’।
১৩। যিকির করা। সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করাকে যিকির বলা হয়। কুরআন ও হাদিসে যে সমস্ত দোয়া উল্লেখ আছে সেগুলো পড়া, অবসর সময়ে অনর্থক কথাবার্তা না বলে আল্লাহকে ডাকা, তার হামদ তাসবিহ ও তার তাকবীর উচ্চারণ করা উচিত। রাসূল (সা) বলেন, আল্লাহর যিকির দ্বারা তোমরা জিহŸাকে সিক্ত রাখ।
১৪। মৃত্যুকে স্মরণ করা। সবার মত আমাকেও এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। পরকালে যাত্রার জন্য আমার হাতে পর্যাপ্ত সম্বল আছে কিনা সেদিকে নজর রাখতে হবে এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। মৃত্যুর স্মরণ থাকা অবস্থায় মানুষ পাপে লিপ্ত হতে পারে না। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করতে বলেছেন।
১৫। মাহে রমযানের শেষ পর্যায়ে নিজ কাজকর্মের সার্বিক মূল্যায়ন করতে হবে। এ মাসে কতটুকু নেক আমল করা সম্ভব হল আর কতটুকু সম্ভব হয়নি তার হিসাব নিয়ে দুর্বলতা ও গুনাহের জন্যে আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে নিতে হবে। ভবিষ্যতে এ গুনাহের পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে জন্য প্রতিজ্ঞা করতে হবে। যতটুকু সৎ আমল করা সম্ভব হয়েছে তার জন্য মহান আল্লাহর কাছে শোকর গুজার হতে হবে। লিখক: শিক্ষক-আমজাদিয়া রফিকুল উলুম ফাযিল মাদ্রাসা।

বিভাগের সংবাদ।

নিউজ ডেস্ক, চকরিয়া২৪।